Tuesday, 16 January 2018

সালমান রুশদি, স্যাটানিক ভার্সেস ও ইসলামিক মৌলবাদের আস্ফালন

ওয়েব ডেস্ক, ১৬ই জানুয়ারী :- আহমেদ সালমান রুশদি বিতর্কের আর একটি নাম। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার চতুর্থ উপন্যাস "দ্য স্যাটানিক ভার্সেস" বিশ্বব্যাপী একটি বড় আকারের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। এর কিছুটা ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ-এর জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত বলে অনেকে মনে করেন। তার পূর্বের বইয়ের মত এতেও রুশদি জাদু বাস্তবতাবাদ ব্যবহার করেছেন এবং সমসাময়িক ঘটনা ও মানুষের সাহায্যে তার চরিত্রগুলো তৈরি করেছেন। বইয়ের নামটি তথাকথিত স্যাটানিক ভার্স বা শয়তানের বাণী-কে নির্দেশ করে। কারও কারও দাবী মতে কুরআনের কিছু আয়াত শয়তান কর্তৃক অনুপ্রাণিত হওয়ায় দৈনিক প্রার্থনার সময় তৎকালীন মক্কার পেগান দেবতা লাত, উজ্জা এবং মানাতের পূজা হয়ে গিয়েছিল। এই আয়াতগুলোকেই শয়তানের বাণী বলা হয়। উপন্যাসটির যে অংশে শয়তানের বাণী সম্পর্কিত বিষয় আছে সে অংশটুকু প্রথম সহস্রাব্দের ইসলামী পণ্ডিত আল-ওয়াকিদি এবং আল-তাবরিরি-র সূত্র অনুসরণ করে লেখা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন ।


এতদসত্বেও বইটি প্রশংসা কুড়িয়েছে পৃথিবী ব্যাপী। ১৯৮৮ সালে এটি বুকার পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় ছিল, যদিও পিটার ক্যারির "অস্কার অ্যান্ড লুসিন্ডা"-র কাছে হেরে যায়। একই বছর উপন্যাসটি হুইটব্রেড অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। দ্য স্যাটানিক ভার্সেস একটি বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল যখন রক্ষণশীল মুসলিমরা বইটিকে ব্লাসফেমি (ধর্মবিরোধী) এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতি ব্যঙ্গাত্মক হিসেবে আখ্যায়িত করে। 

বইটি প্রকাশের পর বেশ কয়েকটি দেশের মুসলিমরা প্রতিবাদ জানায় যা অনেক সময় সহিংস রূপ ধারণ করে। তাঁকে মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়।১৯৮৯ সালে আজকের দিনেই সেই বই পোড়ানো হয়েছিল। ইরানের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এই বই রচনার জন্য ১৯৮৯ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করেছিল।

উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলো ব্রিটিশ মুসলমান, তবে ধার্মিক মুসলমান না। প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীকে সঙ্করীকরণের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, তারা পুরাতন ও নুতনের দ্বন্দ্বে ধরাশায়ী হয়। উপন্যাসটির কট্টর সমালোচকরা মনে করেন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে মেলামেশা নিজের সংস্কৃতি ধ্বংসেরই নামান্তর। অন্যদিকে স্যাটানিক ভার্সেস সঙ্করতা, তথাকথিত আপজাত্য, সংমিশ্রণ, এবং এসব কিছু থেকে উদ্ভূত নতুন সংস্কৃতি, রাজনীতি, চেতনা, চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতকে উদযাপন করে। বইটা সঙ্করীকরণকে উপভোগ করে, পরমকে ভয় করে। 

উপন্যাসটা কিসের প্রতিবাদ করছে? ধর্মবিশ্বাসের অধিকার তো নয়ই। এই গল্প সব ধরণের নৈষ্ঠিকতা ও পরম দাবির বিরোধী। এই প্রতিবাদ আর অশালীন ছিল কি না সেটি নিয়েও বিতর্ক আছে। দাবিগুলির চেয়েও বেশি বিস্ময়কর হল যে এই দাবিগুলো বারবার পুনরাবৃত্তির কারণে সত্যের মর্যাদা পেয়ে গিয়েছে, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বইটা না পড়েই বই আর বইয়ের লেখককে গালাগালি করেছে এবং করছে।

বোদ্ধা পাঠকদের কাছেও বইটা দুর্বোধ্য লেগেছে। বক্তব্যের দিক দিয়ে বইটি দলিত অভিবাসী কমিউনিটির পক্ষে একটি শক্ত দলিল হতে পারত, কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ক্যাজুয়ালটি হয়ে বইটি ওই একই কমিউনিটির কাছে এখন স্রেফ একটি চপেটাঘাত ছাড়া কিছু না। ইসলামিক মৌলবাদের মুঠোবন্দি পাঠকরা একটি সম্পূর্ণ নিরীহ ও হিতার্থী টেক্সটকে টুটি চেপে ধরে বধ করেছে। একজন লেখকের জন্য তাঁর সৃষ্ট কর্মের এই পরিণতি বোধ করি মৃত্যু পরোয়ানার চেয়েও বড় শাস্তি।


No comments:

Post a Comment

loading...