Thursday, 11 June 2020

অবৈধ বিদেশিদের ডিটেনশন সেন্টারে রাখার নির্দেশ হাই কোর্টের

ওয়েব ডেস্ক ১১ ই   জুন  ২০২০:ভারতে অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে যে বিদেশিদের আটক করা হবে, তারা জামিন পেলেও তাদের বাইরে ছাড়া যাবে না। তাদের ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টারে আটক রাখতে হবে বলে কর্নাটক হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে।
হাইকোর্ট বলেছে, কোর্টের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত বা তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে  পর্যন্ত ডিটেনশন সেন্টারই হবে তাদের ঠিকানা।



ব্যাঙ্গালোরে আটক জনা পনেরো কথিত বাংলাদেশির জামিনের আবেদনে রায় দিতে গিয়েই আদালত এ কথা জানায়।

দেশের  মানবাধিকার কর্মী ও আইনি বিশেষজ্ঞরা এই রায়ের তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্বের নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকাল তাকে এভাবে ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখাটা চরম অমানবিক।

‘বাবলু খান ও অনান্যরা বনাম কর্নাটক সরকারে’র যে মামলায় এই রায়টি দেওয়া হয়, সেটির সূত্রপাত বাংলাদেশি সন্দেহে পনেরোজন নারী-পুরুষ ব্যাঙ্গালোর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর।

পুলিশের অভিযোগ, কোনও পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই এরা অবৈধভাবে ভারতে ঢুকেছেন। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা আনা হয়েছে।

এছাড়া ওই দলের একজনের কাছে কয়েকটি বুলেটও নাকি পাওয়া গেছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনেও চার্জ আনা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর এই কথিত বাংলাদেশিরা যখন হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন, তখনই এই রায়টি এসেছে।

এই রায় সম্পর্কে ব্যাঙ্গালোরের মানবাধিকার আইনজীবী মৈত্রেয়ী কৃষ্ণান বলেন, ‘একটা জামিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এখানে যে রায় দিয়েছেন সেটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা বিশাল লম্বা একটা রায়, অবৈধ বিদেশিদের নিয়ে কী করতে হবে তার একটা বিশাল নির্দেশিকাও সেখানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘পুরোটা আমি এখনও পড়ে উঠতে না-পারলেও মোদ্দা কথাটা এটাই – এরা যদি জামিনও পান বা জেল থেকে ছাড়াও পান, তারপর এদের ডিটেনশন সেন্টারে ভরে দিতে হবে।’

আসামের ডিটেনশন সেন্টারগুলোর অভিজ্ঞতা

দেশের  উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন বিদেশিদের জন্য অনেক ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে, আর সেগুলোকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কর্নাটক বা মহারাষ্ট্রের মতো আরও অনেক রাজ্যেও এই ধরনের ডিটেনশন সেন্টার চালু হওয়ার অপেক্ষায়।

পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করছেন, কর্নাটক হাইকোর্টের বিচারপতি কে এন ফণীন্দ্রের এই রায় এই সেন্টারগুলোকেই এক ধরনের বৈধতা দিচ্ছে।

এই সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও লেখালেখি করছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিক অরিজিৎ সেন। তিনি বলেন, ‘ডিটেনশন সেন্টার বলতেই আমাদের সামনে প্রথমেই আসামের ছবিটা ভেসে ওঠে। আর সেই সেন্টারগুলোতে যেভাবে বাসিন্দাদের ট্রিট করা হয়, যেভাবে স্টিগমাটাইজেশনের বিষয়টা আসে, তাতে পুরোটাই মানবাধিকারের একটা বিরাট লঙ্ঘন। এখানে পাঠালে যে কী হবে, সেই প্রশ্ন তাই থেকেই যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আর একটা বিষয় হল, যার নাগরিকত্বের ফয়সালাই হয়নি – মানে কোথা থেকে এসেছেন না-এসেছেন সেটা নিশ্চিতভাবে জানাই যায়নি। তাই তার ক্ষেত্রে তো এভাবে ইচ্ছেমতো ডিটেনশন করাই যায় না!’

ডিটেনশন সেন্টার 'কফিনে শেষ পেরেক'

বস্তুত ভারতের আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কেউ অবৈধ বিদেশি বলে শনাক্ত হলেই তাকে ফরেনার্স ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর প্রশ্ন আসে। আইনজীবী দর্শনা মিত্র বলছিলেন, সেটা হলেও কিন্তু তার সব অধিকার কেড়ে নিয়ে দিনের পর দিন সেই সেন্টারে আটকে রাখা যায় না।

তার ভাষায়, ‘অবৈধ অভিবাসী হলেও তাকে যত দিন খুশি আটকে রাখা যায় না কিন্তু! এটা সংবিধানের আর্টিকল ২১ বা জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন, এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার রায়ও আছে।’

‘আর তারা যে বলছেন বাংলাদেশে ফেরত না-পাঠানো পর্যন্ত ওদের ডিটেনশন সেন্টারেই রাখতে হবে, সেখানেও ফেরত পাঠানো তো তখনই সম্ভব যখন দুটো দেশ তাদের বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে একমত হচ্ছে।’

‘এই প্রক্রিয়ায় অনেক বছরও লেগে যেতে পারে, তবু সুড়ঙ্গের শেষে একটা আলোর আশা থাকে – যে একদিন হয়তো সে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু ফরেনার্স অ্যাক্টের আওতায় কাউকে ডিটেনশন সেন্টার পাঠানো হলে সেটা কিন্তু একটা সিভিল ডিটেনশন – যেখানে জামিনের কোনও সুযোগই নেই। সেই লোকটি ওখান থেকে বেরোতেই পারবে না।’বলছিলেন দর্শনা মিত্র।

তাই তিন মনে করেন, এই ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি ওই ব্যক্তির ‘কফিনে শেষ পেরেক’মেরে দেয়ার মতো বিষয়।

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই ভারতের নানা প্রান্তে কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযান চলছে। কর্নাটক হাইকোর্টের এই রায় সেসব অভিযানে আটককৃদের আইনি অধিকারকে আরও সঙ্কুচিত করে দিল।

No comments:

Post a comment

loading...